মঙ্গলবার ২৮ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
রাজনীতি

জামায়াতের ঘোর বিরোধী, বিএনপিকে নিয়ে ভারত কী ভাবছে ?

নিজস্ব প্রতিবেদন ১৫ এপ্রিল ২০২৫ ০৪:৩৭ এ.এম

জামায়াতের ঘোর বিরোধী, বিএনপিকে নিয়ে ভারত কী ভাবছে ? ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেশী ভারতকে নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটা কথা চালু আছে, তারা বাংলাদেশে এতকাল ‘সব ডিম শুধু একটি ঝুড়িতেই রেখেছে’- মানে শুধু একটি দলের সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক ছিল, আর সেটা আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের অপর প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, বিএনপিকে নিয়ে ভারতের যে কোনও কারণেই হোক একটা যে ‘সমস্যা’ ছিল, সে কথাও সুবিদিত।

দিল্লির নেতা-মন্ত্রী-কূটনীতিকরা অবশ্য যুক্তি দেন- অতীতে বিএনপি শাসনামলের অভিজ্ঞতা ভারতের জন্য তেমন ভাল ছিল না। দু’পক্ষের মধ্যে আস্থা বা ভরসার সম্পর্ক সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আবার উল্টোদিকে বিএনপির পাল্টা বক্তব্য, তারা বাংলাদেশে ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’র বিরোধী। যে কোনও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে দেখতে চায়। কিন্তু তাই বলে তাদের ভারত-বিরোধী বলে চিহ্নিত করার কোনও যুক্তি নেই।

২০১৪ সালে যখন নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি প্রথমবারের মতো ভারতের ক্ষমতায় আসে, বিএনপির তরফে সম্পর্কের এই শীতলতা দূর করার একটা সক্রিয় উদ্যোগ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। সম্ভবত বিএনপির ধারণা ছিল, কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রায় ঐতিহাসিক একটা সুসম্পর্ক রয়েছে। তাদের শাসনের অবসানের পর দক্ষিণপন্থী বিজেপির সঙ্গে বিএনপির মধ্যে একটা নতুন সমীকরণের সূচনা হতে পারে।

প্রাথমিকভাবে তাতে দিল্লির দিক থেকে কিছুটা ইতিবাচক সাড়া মিললেও শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্কও সেভাবে গড়ে উঠেনি। উল্টোদিকে প্রায় রেকর্ড সময়ের মধ্যে জমাট বেঁধেছে নরেন্দ্র মোদী আর শেখ হাসিনার ‘পার্সোনাল কেমিস্ট্রি’ বা ব্যক্তিগত রসায়ন, মজবুত হয়েছে দুই সরকারের সম্পর্ক। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের পরপর তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে ভারতের ‘চোখ বন্ধ করে’ আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থনের ঘটনাও দিল্লির প্রতি বিএনপির অবিশ্বাসকে বদ্ধমূল করেছে।

কিন্তু ২০২৪-র ৫ অগাস্ট বাংলাদেশে যে নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটে গেছে, সেই ঘটনাপ্রবাহ বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে একটা বাঁকবদলের অবকাশ তৈরি করেছে।

দিল্লির পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ভারতের বিশেষ কয়েকটি ‘দাবি’ বা ‘প্রয়োজনে’ যদি বিএনপি ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে ভারতের দিক থেকেও বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে কোনো অসুবিধা থাকার কারণ নেই। কারণ আওয়ামী লীগের চট করে রাজনৈতিক কামব্যাকের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না এবং বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির ভালো ফল করার যথেষ্ঠ সম্ভাবনা আছে। তাই খালেদা জিয়ার দলই যে ভারতের জন্য এই মুহূর্তে সেরা বাজি এবং সম্ভবত একমাত্র বাজি, সেটাও তারা কেউ কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস অবশ্য জোর দিয়ে বলছেন, বিএনপির সঙ্গে ভারতের এতকাল কোনো যোগাযোগ ছিল না, এই কথাটা মোটেও ঠিক নয়। দেখুন এটা একটা ভুল ধারণা! এই ধারণাটা তৈরি হওয়ার কারণ আওয়ামী লীগ একটা খুব লম্বা সময় ধরে ক্ষমতায় ছিল। তো ওই পুরো সময়টা আমরা খুব স্বাভাবিকভাবেই গভর্নমেন্ট-টু-গভর্নমেন্ট লেভেলে তো আওয়ামী লীগের সঙ্গেই ডিল করব, তাই না? তার মানে এই না যে, অন্য কোনো পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে আমরা ডিল করতাম না বা কোনো এনগেজমেন্ট ছিল না! বরং ভালোই ছিল।

তিনি বলেন, আমি নিজে হাইকমিশনার হিসেবে অনেকবার বিএনপি নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছি, বহুবার তাদের বলেছি যে আপনারা ক্ল্যারিফাই করুন। এরকম কনভার্সেশন আমাদের অনেক হয়েছে। এছাড়া সেখানকার তরুণ পার্লামেন্টারিয়ানদের যে ডেলিগেশন ভারতে আসত, তাতে বিরোধী দল ও বিএনপির এমপিরা সব সময় থাকতেন। কাজেই এটা বলা ভুল, আমরা ওদের সঙ্গে কথাই বলতাম না বা কোনো এনগেজমেন্ট ছিল না। তবে বিএনপির সঙ্গে ভারতের যে ঠিক আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, এ কথাটা দু’দেশে সকলেই জানেন ও মানেন।

বিজেপির সিনিয়র নেতা ও পার্লামেন্টারিয়ান শমীক ভট্টাচার্যর বলেন, আমরা চাই বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরে আসুক, বাংলাদেশে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। মানুষ যাকে চাইবে সেই দেশে, আমরা তাকে বেছে নেবে। কিন্তু মৌলবাদ থেকে সরতে হবে।

এদিকে জামায়াত-ই-ইসলামী বিএনপির সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব বাড়ছে। আর এই কারণে দিল্লির এখন একটা সম্পর্ক স্থাপনের ভাল সুযোগ বলে মনে করছেন ভারতের কূটনীতিকরা।

এই বিষয়ে ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস বলেন, ডেফিনিটলি জামায়াত আর বিএনপির মতবিরোধগুলো এখন খুব স্পষ্ট। ওনাদের একজন বড় নেতা এটাও বলেছেন যে কোনও অ্যালায়েন্স হওয়া সম্ভব না। আমি নিশ্চিত, এই ডেভেলপমেন্টগুলো ভারত সরকার নিজেদের তরফ থেকে খুব সতর্কতার সঙ্গে দেখছে এবং অ্যাসেস করছে।

জামায়াতের ইসলামীর ব্যাপারে বিজেপির এমপি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, আমরা স্পষ্টতই জামাতের চিন্তাভাবনা, তালেবানেইজেশনের কনসেপ্টের ঘোরতর নিন্দা করি। এটার বিরোধিতা আমরা করছি এবং করেও যাবো।

তিনি আরও বলেন, ভারতের কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকরা এখনও একান্ত আলোচনায় পরিষ্কার বলছেন, আগামী দিনে বিএনপির সঙ্গে তাদের যে কোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ‘শর্ত’ হতে হবে; জামায়াতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সঙ্গ তাদের ত্যাগ করতেই হবে।

অন্যদিকে বিএনপি ও ভারতের মধ্যেকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্ভবত সবচেয়ে বড় অস্বস্তির জায়গাটা হল ২০০১ থেকে ২০০৬ অবধি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চার দলীয় জোট সরকারের শাসনামলের বিভিন্ন ঘটনা। 

ভারত বিশ্বাস করে, ওই সময় আলফাসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশে ঢালাও আশ্রয় পেয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আলফার জন্য ট্রাকে করে অস্ত্র পাচারের ঘটনাও এই সময়কারই।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক শান্তনু মুখার্জি আবার মনে করেন, নির্বাচনে জিতে বাংলাদেশের ক্ষমতায় এলে বিএনপির সেই পুরনো রেকর্ড ‘অবশ্যই বদলাতে পারে’ এবং ভারতও তখন উপযুক্ত সাড়া দিতে প্রস্তুত থাকবে।

এছাড়া ভারতের পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সেভেন সিস্টার্সের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যদি বাংলাদেশে ‘প্রশ্রয়’ না পায়। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুবিধা বহাল থাকে। তাহলে বিএনপির সঙ্গে ‘ডিল’ করতেও ভারতের কোনও সমস্যা নেই।

এইদিকে নির্বাচন নিয়ে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই হোক বা অন্য যে কোনও কারণেই হোক; ভারত নির্বাচনের আগে অন্তত বাংলাদেশের বিশেষ কোনও দলের প্রতিই প্রচ্ছন্ন সমর্থন জানানো হবে না। যদিও করে তাহলে অন্তত সেটা প্রকাশ করা হবে না।

এই মুহুর্তে ভারতের কৌশলটাই- বাংলাদেশে যত তাড়াতাড়ি একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনে চাপ দেওয়া এবং তাতে যারাই জিতে ক্ষমতায় আসুক, তাদের সঙ্গে একটা ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ তৈরির পথ প্রস্তুত করে রাখা।

বিজেপির রাজ্যসভা এমপি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তার বেশি থাকবে। এটাই কাঙ্ক্ষিত ও এটা হওয়াই স্বাভাবিক।

সোর্স/বিবিসি বাংলা

তথ্য সুত্র: ইত্তেফাক


এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

বিএনপির কাছে নতিস্বীকার করেই একই দিনে দুই নির্বাচন: জামায়াত আমির

news image

রংপুর-৪ আসন: ৮০টি কেন্দ্রে এগিয়ে এনসিপির আখতার হোসেন

news image

১৭টি আসনে বিজয়ের তথ্য দিল জামায়াত

news image

নিজ কেন্দ্রে হারলেন জামায়াত আমির

news image

মামুনুল হক ও ববি হাজ্জাজের মধ্যে চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

news image

বগুড়ায় নিরঙ্কুশ বিজয়ের পথে তারেক রহমান

news image

মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষা কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিলেন মামুনুল হক

news image

‘ইনশাআল্লাহ আমি আশাবাদী, মানুষ উন্নয়নের স্বার্থে ধানের শীষের পক্ষে রায় দেবে’

news image

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যাত্রা নতুনভাবে শুরু হলো: মির্জা ফখরুল

news image

নিজ আসনে ভোট দিলেন জামায়াত আমির

news image

যাদের ভোট না দেওয়ার পরামর্শ দিলেন তাসনিম জারা

news image

মুনতাসির মাহমুদকে অব্যাহতি ও কারণ দর্শানো নোটিশ এনসিপির

news image

প্রত্যেক উপদেষ্টা আখের গোছানোর কাজ করে রেখেছেন: সামান্তা

news image

বিপ্লবী নয়, কিংস পার্টির মতো আচরণ করছে এনসিপি: ইশরাক

news image

দোসররা আবার সুযোগ পেলে বলবে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি তাণ্ডব: শিশির

news image

বিএনপির বিবৃতি, সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব রক্ষায় অপরাধের সুষ্ঠু ও নির্মোহ বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

news image

গুমের ডকুমেন্টরির শুটিংয়ে অংশ নিয়ে যা বললেন সালাহউদ্দিন

news image

বিএনপি নেতা ডা. রফিককে দেখতে গেলেন জোনায়েদ সাকি

news image

হাসিনা-ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারীদের উদ্দেশে যা বললেন নুরুল হক নুর

news image

পিআর নয় বিদ্যমান নির্বাচন পদ্ধতিতেই আস্থা রাখতে চায় বিএনপি: ডা. জাহিদ

news image

সব কিছুরই শেষ আছে: আদালতে পলক

news image

রাউজানে নিহত ব্যক্তি বিএনপির কেউ নয়: রিজভী

news image

এনসিপি এনসিপি শাপলা প্রতীক না পেলে কী করবে?

news image

দেশের অন্তত ৪০টি টেলিভিশন-পত্রিকায় প্রভাব খাটাচ্ছে বিএনপি: সারজিস

news image

নির্বাচন নিয়ে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ হচ্ছে, সজাগ থাকুন: মির্জা ফখরুল

news image

ভারতের অর্থায়নে আ.লীগ-ছাত্রলীগ ঝটিকা মিছিল করছে: শিবির সভাপতি

news image

লন্ডনে ড. ইউনূসের সঙ্গে কী কথা হয়েছিল, জানালেন তারেক রহমান

news image

অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক কাজের ওপর নির্ভর করে: তারেক রহমান

news image

কুরআন অবমাননার প্রতিবাদ জানাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি হেফাজতের আহ্বান

news image

তোফায়েল আহমেদের অবস্থা ভালো নয়:পরিবার