বৃহস্পতিবার ১৫ জানু ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
শিক্ষা

স্বাধীনতার মালিক কে?(৪৭ থেকে ৭১, ৭১ থেকে ২৪)

ফেরারি মিজান ২১ ডিসেম্বার ২০২৫ ০৮:৫৮ পি.এম

স্বাধীনতার মালিক কে?(৪৭ থেকে ৭১, ৭১ থেকে ২৪) ছবি: সংগৃহীত

৪৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডের মানুষের সামনে প্রশ্ন ছিল—কে আমাদের শাসন করছে, কারা আমাদের উপর বৈষম্য চাপিয়ে দিচ্ছে। আর ৭১–এর পর থেকে ২৪ পর্যন্ত এসে প্রশ্নটি বদলে গেছে—আমরা কি সত্যিই নিজেদের মতো করে শাসিত হচ্ছি, নাকি স্বাধীনতার মালিক অন্য কেউ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ইতিহাসের দুই পর্বকে পাশাপাশি রেখে দেখতে হবে।

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তান একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার শিকার হয়। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পদ, সামরিক কর্তৃত্ব—সবই কেন্দ্রীভূত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক শোষণ, প্রশাসনিক বঞ্চনা ও সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ক্রমে উপলব্ধি করে যে তারা একটি উপনিবেশিক কাঠামোর ভেতর বসবাস করছে। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপই ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল কেবল একটি পতাকা বা ভৌগোলিক সীমানা অর্জন নয়। এর গভীরে ছিল আত্মপরিচয়, মর্যাদা এবং নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষা। সেই সময়ের জনগণ সরাসরি নিপীড়নের শিকার ছিল বলেই তারা জীবন বাজি রেখে সংগ্রামে নেমেছিল। ১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতা তাই ছিল শোষণের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিজয়।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই স্বাধীনতার প্রকৃত মালিকানা কি আমরা ধরে রাখতে পেরেছি?

স্বাধীনতার পরবর্তী ৫৪ বছরে বাংলাদেশ বারবার এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহু বাংলাদেশির কাছে একটি ধারাবাহিক আধিপত্যের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন সংকট, বাণিজ্য ঘাটতি, অসম চুক্তি, জ্বালানি ও ট্রানজিট ইস্যু, এমনকি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব—এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরে জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ক্ষোভ ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে নয়; বরং ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে। অনেকের কাছে মনে হয়েছে, ভারত বাংলাদেশকে সমমর্যাদার স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। ফলে স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশ যেন নতুন এক প্রকার নির্ভরতা ও চাপের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

যে প্রজন্ম ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছিল, তারা ছিল প্রত্যক্ষ নিপীড়নের শিকার। আজকের তরুণ প্রজন্ম ভিন্ন বাস্তবতায় বড় হলেও তারা প্রত্যক্ষ করছে স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা। তারা দেখছে—নির্বাচন, পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে বিদেশি স্বার্থ কতটা প্রভাব ফেলছে। ডিজিটাল যুগের এই প্রজন্ম তথ্যপ্রবাহে সচেতন, তুলনামূলক বিশ্লেষণে অভ্যস্ত এবং প্রশ্ন করতে ভয় পায় না।

২৪ সালের আগের ও পরের সময়কে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও মানসিক পরিবর্তন দৃশ্যমান, তা হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। এই প্রজন্ম আর কোনো “বন্ধুত্বের নামে আধিপত্য” মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। তারা চায় পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক, ন্যায্যতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা।

ইতিহাস আমাদের শেখায়—যে জাতি একবার শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, সে জাতি নতুন রূপে আসা শোষণও মেনে নেয় না। পাকিস্তানি শাসনের বৈষম্য যেমন একসময় অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল, তেমনি আজ ভারতীয় আধিপত্যও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নয়; এটি মূলত আধিপত্যবিরোধী, ন্যায়ভিত্তিক এবং আত্মমর্যাদার চেতনা।

আজ তাই প্রশ্ন ওঠে—৪৭ থেকে ৭১–এ যদি স্বাধীনতার মালিক ছিল না এই ভূখণ্ডের মানুষ, তবে ৭১ থেকে ২৪–এ সেই মালিকানা কি পুরোপুরি তাদের হাতে রয়েছে? নাকি স্বাধীনতা আজও নানা রূপে সীমাবদ্ধ?

২৪–পরবর্তী প্রজন্মের বার্তা স্পষ্ট: তারা আর পরোক্ষ শাসন বা প্রভাবের ছায়ায় নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে চায় না। তারা একটি সত্যিকারের সার্বভৌম, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশ চায়—যেখানে জনগণই হবে স্বাধীনতার একমাত্র মালিক। ইতিহাস যেমন ১৯৭১ সালে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল, বর্তমান সময়ও হয়তো তেমনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

লেখক: ফেরারি মিজান
মেইল ferarimijan1@gmail.com


এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

স্বাধীনতার মালিক কে?(৪৭ থেকে ৭১, ৭১ থেকে ২৪)

news image

মাদকমুক্ত সমাজের স্বপ্নে তরুণরা

news image

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন কাঠামো ও নম্বর বণ্টনে নতুন নিয়ম

news image

শাপলা চত্বরের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে: শিক্ষা উপদেষ্টা

news image

স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের এমপিও আবেদন নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত

news image

ইসলামী বইমেলায় বাড়ছে পাঠকদের ভিড়

news image

পিআর নিয়ে গণভোট করা যেতে পারে: জাকসু ভিপি

news image

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ‘পূর্ণাঙ্গ শাটডাউন’ কর্মসূচি স্থগিত, কর্মবিরতি চলবে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের

news image

২৫ তারিখেই রাকসু নির্বাচন চান স্বতন্ত্র প্রার্থীরা

news image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডাকাতের গ্রাম’ থেকে মানুষের জনপদ হয়ে উঠছে: মির্জা গালিব

news image

‘জবাবদিহিতায় ব্যর্থ হলে পুনরায় ডাকসু নির্বাচন আদায় করব’

news image

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিং নিষিদ্ধ

news image

প্রাথমিকে ফের বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক

news image

আমির হামজাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে: ঢাবি ছাত্রদল

news image

এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ কবে?

news image

জাকসুর ভিপি, জিএস ও এজিএসের কার বাড়ি কোথায়

news image

যে কারণে জাকসুতে ছাত্রদলের বিপর্যয়

news image

রোকেয়া হল থেকে একমাত্র ভোট পেলেন রাকিবুল, তাকেই বিয়ে করতে চান...

news image

নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে ডাকসুর প্রথম সভা

news image

বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্ট ফোরামের নতুন কমিটি গঠন

news image

জুলাইযোদ্ধা সেই ফাইয়াজের বড় ভাই জাকসুর জিএস

news image

জাকসুর ফল ঘোষণার পূর্বে হাসিনার বিচার চেয়ে স্লোগান

news image

জাকসু নির্বাচনের ফল প্রকাশ শুরু

news image

এগিয়ে এলো জাকসুর ফল ঘোষণার সময়

news image

জাকসু নির্বাচন কমিশনের আরেক সদস্য স্নিগ্ধার পদত্যাগ

news image

শেষ হলো জাকসুর ভোট গণনা

news image

রোববার বন্ধ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

news image

অবশেষে সন্ধ্যা সাতটায় জাকসুর ফল ঘোষণা

news image

জাকসু নির্বাচন, ১৫ হলের ভোট গণনা শেষ, একটার মধ্যে শেষ করার আশা

news image

সাদিক-ফরহাদ যে সুযোগ-সুবিধা পাবেন