বৃহস্পতিবার ১৫ জানু ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
ফিচার

পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ও ভারতের রাষ্ট্রীয় সংহতির ভবিষ্যৎ

ফেরারি মিজান ২৯ ডিসেম্বার ২০২৫ ০৯:৩৪ এ.এম

পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ও ভারতের রাষ্ট্রীয় সংহতির ভবিষ্যৎ ছবি: সংগৃহীত

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন ছিল উপনিবেশ-উত্তর বিশ্বের অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক ঘটনা। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সংঘটিত এই বিভাজন শুধু একটি ভূখণ্ডকে ভাগ করেনি; এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনৈতিক আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। স্বাধীনতার সাত দশক পরও প্রশ্ন থেকে যায়—এই তত্ত্বের প্রভাব কি সত্যিই ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ, নাকি তা এখনো ভারতের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতাকে প্রভাবিত করছে?

স্বাধীন ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক সমতা ও বহুত্ববাদকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল—ধর্ম, জাত বা ভাষার ঊর্ধ্বে উঠে একটি নাগরিক রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন কখনোই পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে তা নতুন রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশলের মাধ্যমে পুনরুত্থান ঘটিয়েছে।

বর্তমান ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের প্রভাব এখনো দৃশ্যমান। নির্বাচনী রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণ একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—যা কেবল রাজনৈতিক ভাষ্যেই নয়, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়। ফলে নাগরিক পরিচয়ের বদলে ধর্মীয় পরিচয় ক্রমশ প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠছে।

এখানে দ্বিজাতিতত্ত্ব সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও, তার মৌলিক যুক্তি—ভিন্ন পরিচয় মানেই রাজনৈতিক অবিশ্বাস—নতুন রূপে সক্রিয়। তখন রাষ্ট্র ভাগ হয়েছিল এই যুক্তিতে যে দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায় একসঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে অক্ষম। আজ রাষ্ট্র ভাঙনের কথা প্রকাশ্যে বলা না হলেও, নীতিগত ও সামাজিক স্তরে এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে যেখানে সমান নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

দ্বিজাতিতত্ত্ব আজ আর সরাসরি উচ্চারিত হয় না, কিন্তু তার মানসিক কাঠামো টিকে আছে নতুন ভাষায়, নতুন মোড়কে। তখন বলা হয়েছিল—“একসঙ্গে থাকা সম্ভব নয়”; আজ বলা হচ্ছে—“একসঙ্গে থাকলেও সবাই সমান নয়।” এই বয়ান রাষ্ট্রের ভিতকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, যেসব বহুজাতিক বা বহুধর্মীয় রাষ্ট্র নাগরিক সমতার নীতি থেকে সরে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, সেসব রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকতে পারেনি। সুদান বা শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখায়—পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্য শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদকে উসকে দেয়।

ভারতের ক্ষেত্রে এখনও পরিস্থিতি সেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন, ফেডারেল কাঠামো, সাংবিধানিক আদালত ও নির্বাচনী গণতন্ত্র—এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো রাষ্ট্রীয় সংহতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সম্প্রসারণ, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং সাংস্কৃতিক একরূপতার চাপ এই কাঠামোগুলোকে দুর্বল করছে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্র ভাঙে প্রথমে মানসিকভাবে, পরে ভৌগোলিকভাবে। যখন কোনো জনগোষ্ঠীর বড় অংশ মনে করতে শুরু করে যে রাষ্ট্র তার প্রতিনিধিত্ব করছে না, তখন বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয়, জাতিগত ও আঞ্চলিক অসন্তোষের যে প্রকাশ দেখা যাচ্ছে, তা এই মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতারই লক্ষণ।

এই প্রেক্ষাপটে ভারত আজ একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি—রাষ্ট্র কি নাগরিকত্বের ভিত্তিতে নিজেকে পুনর্নির্মাণ করবে, নাকি পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেবে? দ্বিতীয় পথটি আপাতভাবে রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্রীয় সংহতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

দ্বিজাতিতত্ত্ব ইতিহাসের একটি অধ্যায়—কিন্তু তার মানসিক কাঠামো যদি বর্তমান রাষ্ট্রচিন্তাকে প্রভাবিত করতে থাকে, তবে ভবিষ্যতের ভারত আরও জটিল বিভাজনের মুখে পড়তে পারে। রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত ভূগোলের নয়, নাগরিক আস্থার উপর নির্ভর করে। আর সেই আস্থা ক্ষয় হলে, কোনো সংবিধানই রাষ্ট্রকে একা ধরে রাখতে পারে না।

লেখক: ফেরারি মিজান
মেইল ferarimijan1@gmail.com


এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ও ভারতের রাষ্ট্রীয় সংহতির ভবিষ্যৎ

news image

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নৈতিকতার সংকট—সময় কি আত্মসমালোচনার?

news image

রাজনীতি, বুদ্ধিজীবী ও টকশো-সংস্কৃতি: বিভ্রান্ত এক দেশ

news image

পেশা নয়, সেবা—এটাই হোক রাজনীতি

news image

যেসব লক্ষণে বুঝবেন আপনার থেরাপি প্রয়োজন

news image

ইসলামিক রাজনীতি বনাম গণতান্ত্রিক রাজনীতি: মুসলমানদের অন্তর্দ্বন্দ্ব

news image

শারীরিক ও মানসিক সুস্থ থাকতে দরকার আলিঙ্গনের

news image

সঙ্গী নার্সিসিস্ট কি না চিনবেন যেভাবে

news image

৬ উপসর্গে এআই নয়, চাই সরাসরি চিকিৎসক

news image

এসিতে বিস্ফোরণ? এই ৫টি সংকেত কখনোই উপেক্ষা করবেন না!

news image

যেভাবে বুঝবেন আপনার বিশ্রাম দরকার

news image

বছরের শেষ সূর্যগ্রহণ আজ

news image

৪৩০ জনকে নিয়োগ দেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, লাগবে এসএসসি পাস

news image

বাংলাদেশের স্বৈরতন্ত্রের ইতিহাস ও পি আর পদ্ধতির প্রযোজ্যতা

news image

জাপানিদের দীর্ঘ ও সুখী জীবনের রহস্য

news image

"একাত্তরের অর্জিত নামমাত্র স্বাধীনতা"

news image

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শকে বিতর্কিত করতেছে কারা?

news image

সোলো ট্রিপের জন্য ঘুরে আসুন এই ৫টি দেশে

news image

পুরো মানুষ গিলে ফেলতে সক্ষম যে ৬টি ভয়ংকর প্রাণী

news image

চন্দ্রগ্রহণ খালি চোখে দেখা কি নিরাপদ?

news image

খোলা চিঠি

news image

দামাল কবির জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানিয়ে মঞ্চে আবারো ‘দামাল ছেলে নজরুল’

news image

তারেক জিয়ার উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি

news image

রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নির্বাচন ব্যবস্থা!

news image

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রয়াণ দিবসে সুরেলা সন্ধ্যা

news image

রবিন রাফানের এআই মাস্টারক্লাসে অভূতপূর্ব সাড়া, দ্বিতীয় সিজনের ঘোষণা

news image

যেভাবে অনলাইনে ভাইরাল হওয়া কারওয়ান বাজারের তরমুজ বিক্রেতার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো

news image

ঈদ সালামি থেকে ঈদী: সংস্কৃতির বিবর্তন

news image

সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ৪০০ বছরের পুরোনো মসজিদ

news image

শিশু সাহিত্যের ধ্রুবতারা শিবুকান্তি দাশ